সাংবাদিকতা কেবল কোনো পেশা নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ। সাংবাদিকরা সত্য প্রকাশ করে জনগণকে তথ্যসমৃদ্ধ করেন, ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন এবং দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সমাজকে সতর্ক করেন। অথচ এ মহৎ দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তাঁদেরকেই সবচেয়ে বেশি হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হত্যার শিকার হতে হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও ভয়াবহ। স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ, রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি কিংবা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করলে সাংবাদিকদের উপর নেমে আসে ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ।
বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে বহু সাংবাদিক খুন হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF) ও কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিক নির্যাতনে অন্যতম শীর্ষ দেশ। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা স্থানীয় দুর্নীতি, ভূমিদস্যুতা, অবৈধ বালু উত্তোলন, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ হত্যার ঘটনায় সঠিক বিচার হয়নি, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দোষীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সাংবাদিকদের দমিয়ে রাখার আরেকটি বড় অস্ত্র হলো মিথ্যা মামলা। বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) বা সাইবার সিকিউরিটি আইন ব্যবহার করে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তাদের অনিয়ম বা রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি প্রকাশ করলে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি বা ভুয়া তথ্য প্রচারের অভিযোগ এনে মামলা দেওয়া হয়। এতে সাংবাদিকদের সময়, অর্থ ও মানসিক শক্তি নষ্ট হয়; পরিবার থাকে আতঙ্কে; আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শিকলে বাঁধা পড়ে।
সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের উপর হামলা, ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া, ছবি মুছে দেওয়া কিংবা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা এখন নিত্যদিনের। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতারা সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে চাপ সৃষ্টি করেন। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে আক্রমণ চালায়। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় দলের ক্ষেত্রেই সাংবাদিকরা নিরাপদ বোধ করেন না, কারণ সমালোচনা সহ্য করার সংস্কৃতি রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় শত্রু দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীরা। তাঁদের অপরাধ ও অনিয়ম সংবাদে প্রকাশিত হলে জনমত গড়ে ওঠে, প্রশাসনের নজর পড়ে, মামলা হয়। তাই তাঁরা সাংবাদিকদের শত্রুতে পরিণত করে ভয় দেখায়, অপহরণ করে, হত্যা করে। দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশ থাকায় সাংবাদিকরা ন্যায়বিচার পান না।
হরতাল, অবরোধ বা রাজনৈতিক সংঘাতে সাংবাদিকরা দ্বিমুখী হামলার শিকার হন। একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেয়, মারধর করে বা গ্রেপ্তার করে; অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মীরা তাঁদেরকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হামলা চালায়। এভাবে সাংবাদিকরা চরম অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে কাজ করেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষা করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে সরকার অনেক ক্ষেত্রে নীরব দর্শক কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে। সাংবাদিক হত্যা বা হামলার ঘটনায় বিচার না হওয়া, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রশাসনিক সুরক্ষা না পাওয়া—সবই প্রমাণ করে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। ফলে সরকারের উপরই এই দায় বর্তায়।
সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন ও হত্যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিসরে ক্ষুণ্ণ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স ও কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস নিয়মিতভাবে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশ প্রতিবছর পিছিয়ে যাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আইনের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সাংবাদিকদের প্রতি সহনশীল হতে হবে। চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সাংবাদিক সুরক্ষায় দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে। পঞ্চমত, গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ষষ্ঠত, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবগুলোকে আরও সক্রিয় হয়ে সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
সাংবাদিকরা জনগণের কণ্ঠস্বর। তাঁদের উপর আঘাত মানে জনগণের কণ্ঠরোধ। সাংবাদিকদের উপর ধারাবাহিক নির্যাতন, হত্যা, মিথ্যা মামলা, রাজনৈতিক অসহযোগিতা ও দুর্নীতিবাজ-সন্ত্রাসীদের হামলার দায়ভার সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। রাষ্ট্র যদি গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে সর্বাগ্রে করণীয়। অন্যথায় গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ মানে জনগণের অধিকার হরণ—যা কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়।
